Home » খাবারের প্রিজারভেটিভ কিভাবে কাজ করে

খাবারের প্রিজারভেটিভ কিভাবে কাজ করে

how-do-food-preservatives-work

আমরা বাজার থেকে যে সব প্যাকেট করা খাবার কিনে আনি তার অধিকাংশ তেই প্রিজারভেটিভ মেশানো থাকে। তা সে আচার, বিস্কুট, বা মাখন যাই হোক না কেন। খাবারের মধ্যে প্রিজারভেটিভ নামে সালে এক থেকে দু দিনের বেশি ভালো রাখা সম্ভব নয়। 

বাজার থেকে যখন আপনি কোন প্যাকেট করা খাবার কিনবেন তখন যদি তার পেছনে থাকা উপকরণ গুলি একটু ভালোভাবে পড়ে দেখেন তাহলে দেখবে তার মধ্যে সব সময়ই “ফুড প্রিজারভেটিভ” কথাটা উল্লেখ করা থাকে।  আবার অনেক সময় “preservative E211” উল্লেখ করা থাকে। 

সাধারণত খাবারের কোম্পানিগুলি এই প্রিজারভেটিভ ব্যবহার করে যাতে সেই খাওয়ার অনেকদিন ধরে ভালো রাখা সম্ভব হয়। সাধারণভাবে এই প্রিজারভেটিভ বিভিন্ন ধরনের হয়ে থাকে, এবং একেক ধরনের প্রিজারভেটিভ একেক রকম ভাবে খাবারটি ভালো রাখে।  

 লবণ ও চিনি কিভাবে খাবার সংরক্ষণ এর কাজে লাগে 

অনেক প্রাচীনকাল থেকে লবণ এবং চিনি কে খাওয়ার ভালো রাখার জন্য ব্যবহার করা হয়ে আসছে। 

লবণ সবজি, মাছ এবং মাংসের উপর সল্টিং, সল্ট কিউরিং বা কর্নিং নামক প্রক্রিয়ায় ব্যবহার করা হয়। চিনি জ্যাম এবং জেলিতে এবং মাংসে ব্যবহৃত হয়। শাকসবজি সাধারণত অনেক পরিমান লবণ ও পানির মিশ্রণে এর সাহায্যে ধুয়ে সংরক্ষণ করা হয়। 

খাবার-দাবার সংরক্ষণের ক্ষেত্রে লবণ এবং চিনি কিভাবে কাজ করে তা বোঝা অত্যন্ত সহজ।  লবণ এবং চিনির যদি কোন তরল মাধ্যমে একসঙ্গে মেশান হয় তাহলে সেই তরল মাধ্যমটি হাইপারটোনিক  হয়ে ওঠে। এই হাইপোটনিক হয়ে ওঠার অর্থ হলো, লবণ মেশানো দ্রবণটি ব্যাকটেরিয়া কোষের মধ্যে থাকা দ্রবণের তুলনায় অনেক বেশি ঘনত্বের হয়ে ওঠে । 

তারপর যা ঘটে তা হল প্লাজমোলাইসিস নামক একটি সহজ প্রক্রিয়া। জলের অণুগুলি তাদের উচ্চ ঘনত্ব থেকে তাদের নিম্ন ঘনত্বে চলে যায়। এর মানে হল যে তারা ব্যাকটেরিয়া কোষের ভিতর থেকে বাইরের পরিবেশে চলে যায়। ভারসাম্য বজায় রাখার জন্য এটি ঘটে, তবে এটি ব্যাকটেরিয়া কোষকে পানিশূন্য করে দেয়। তারপর উপযুক্ত পরিমাণ পানির অভাবে এটি মারা যায়। 

এই ধরনের পরিস্থিতিতে লবণ বা চিনির অণুর উচ্চ ঘনত্ব কখনও কখনও জীবাণুর এক-কোষের শরীরকে নষ্ট করে দিতে পারে। কোষের বাইরের এবং ভিতরের চাপের পার্থক্যের জন্য এটি হয়।

এছাড়াও চিনি এবং লবণ একটি জীবাণুর এনজাইমেটিক কার্যকলাপ বাঁধা দিতে পারে। চিনি এবং লবণ জীবাণুর ডিএনএর আণবিক গঠনকেও দুর্বল করে দিতে পারে, যার ফলে জীবাণুগুলো স্বাভাবিকভাবে কাজ করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। 

সাধারণত চিনি পরোক্ষভাবে খাদ্য সংরক্ষণকারী হিসেবেও কাজ করে বলে ধরা হয়। এটি সাধানত খাবারের মধ্যে বিভিন্ন অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল পদার্থের গঠনকে ত্বরান্বিত করে।  

নাইট্রেট এবং নাইট্রাইট এর ভূমিকা 

এটি এমন একটি খাদ্য সংরক্ষণকারী  পদার্থ যা প্রাকৃতিকভাবে পানি, তাজা ফল এবং বিভিন্ন শাকসবজিতে পাওয়া যায়। নাইট্রেট এবং নাইট্রাইট প্রাথমিকভাবে বিভিন্ন ধরনের মাংস, পনির, চিস ইত্যাদি সংরক্ষণের সময় পনির মধ্যে যোগ করা হয়। নাইট্রেট এবং নাইট্রাইট কে সাধানরত লবণের আকারে ব্যবহৃত হয়। 

এগুলি জীবাণুর দ্বারা খাদ্যের ক্ষয় রোধ করে, বিশেষ করে ক্লোস্ট্রিডিয়াম বোটুলিনাম, যা বোটুলিজম সৃষ্টি করে, যা খাদ্যের বিষক্রিয়ার একটি মারাত্মক রূপ। বলা হয় নাইট্রিক অক্সাইড (নাইট্রাইট থেকে গঠিত) ব্যাকটেরিয়ার আয়রন-সালফার প্রোটিনের সাথে বিক্রিয়া করে , যা তাদের বিপাকের জন্য অপরিহার্য। ব্যাকটেরিয়ার বিপাক ক্রিয়া বাধা দেওয়ার সাথে সাথে নাইট্রাইট সংরক্ষণকারী হিসাবে কাজ করে।

পরীক্ষা করে জানা গেছে যে  C. বোটুলিনাম ধারণকারী একটি গ্লুকোজ মাধ্যমে নাইট্রেট যোগ করার ফলে ব্যাকটেরিয়ার আন্তঃকোষীয় ATP ঘনত্ব দ্রুত হ্রাস ঘটে। এভাবে নাইট্রাইট এই ব্যাকটেরিয়া থেকে আমাদের খাবারকে রক্ষা করার কাজ করে।  

বিভিন্ন ধরনের মাংস সংরক্ষণের ক্ষেত্রে নাইট্রেট এর ব্যবহারের ফলে   মাংসের স্বাদ নষ্ট এবং দুর্গন্ধ সৃষ্টি হওয়ার হাত থেকে রক্ষা করা যায়। মাংসের অপ্রীতিকর গন্ধ এবং স্বাদের । নাইট্রেট এবং নাইট্রাইট উভয়ই মাংসকে রঙ এবং এর স্বাদ বাড়ায়। 

BHA এবং BHT এর ভুমিকা

বিএইচএ(BHA) অর্থাৎ বুটিলেটেড হাইড্রোক্সিয়ানিসোল (Butylated Hydroxyanisole)  এবং বিএইচটি(BHT) অর্থাৎ বিউটিলেটেড হাইড্রোক্সিটোলুইন (Butylated Hydroxytoluene)। এই দুটি কে প্রধানত খাবারের প্রিজারভেটিভ ব্যবহার করা হয়। জন্য দাঁড়িয়েছে। যেমন বিভিন্ন পানীয়, ফাস্ট ফুড, প্রক্রিয়াজাত আলু, স্ন্যাক ফুড ইত্যাদি খাবারে এই গুলির ব্যবহার সর্বাধিক। 

এগুলিকে তাদের অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট বৈশিষ্ট্যের কারণে খাদ্য সংরক্ষণকারী হিসাবে ব্যবহার করা হয়। এটি সবাই জানে যে বাতাস বা অক্সিজেনের সংস্পর্শে খাবার নষ্ট হয়ে যায়। এটি ঘটে কারণ অক্সিজেন খাদ্যে বায়বীয় ব্যাকটেরিয়া কে বংশ বিস্তার করতে সাহায্য করে। অধিকাংশ খাদ্যে প্রাকৃতিকভাবে থাকা অক্সিডাইজিং এনজাইমগুলি অক্সিজেন এবং খাদ্যে উপস্থিত উপাদানগুলির মধ্যে প্রতিক্রিয়াকে তরান্বিত করে, যার ফলে খাবার খুব তাড়াতাড়ি খারাপ হতে শুরু করে।

খাদ্যের মধ্যে থাকা ফ্যাট এর জন্য এই অক্সিডেশনই দায়িত্ব। অনেক সময় বিভিন্ন ধরনের ফলমূল কাটা অবস্থায় বাইরে রেখে দিলে সেটি উপরে কালো রঙের একটা আস্তরণ পড়তে দেখা যায় এর পেছনেও অক্সিডেশন এর হাত রয়েছে। বিএইচএ(BHA) খাবারে উপস্থিত ফ্যাট কে বাড়তে বাধা দেয়। এক্ষেত্রে এটি একটি ডি-ফোমিং এজেন্ট হিসাবেও কাজ করে । 

যেহেতু বিএইচএ এবং বিএইচটি অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, তাই অক্সিজেন তাদের সাথে বিক্রিয়া করে। এইভাবে, খাদ্যে উপস্থিত চর্বি এবং তেল অক্সিজেনের সাথে বিক্রিয়া করতে পারেনা।  

এটা শুধু মাত্র খাবারের জন্য নয়; BHA এবং BHT বিভিন্ন প্রসাধন দ্রব্য এবং ফার্মাসিউটিক্যাল বা ওষুধে ও ব্যবহার করা হয়।

বেনজোয়িক অ্যাসিড এবং বেনজয়েট লবণ এর কাজ

এগুলি সাধারণত একটি বিশেষ ধরনের কার্বনেটেড পানীয়গুলিতে প্রিজারভেটিভ হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এছাড়াও বিভিন্ন ধরনের খাবার যেমন সালাদ, সিরাপ, জ্যাম, জেলি, কিমা, আচার, পাই, পেস্ট্রি ফিলিংস, ফলের ককটেল, সয়া সস এবং অন্যান্য অনেক খাদ্য আইটেমের সংরক্ষণ এর জন্য ব্যবহার করা হয়। “প্রিজারভেটিভ E211” হল সোডিয়াম বেনজয়েট(sodium benzoate), এটিকে অধিকাংশ ক্ষেত্রে আচার এবং কেচাপের মতো অ্যাসিডিক খাবারে যোগ করা হয়।

বেনজোইক অ্যাসিড এবং বেনজয়েট প্রধানত অ্যান্টি-ব্যাকটেরিয়াল এবং এইভাবে খাবারের ক্ষতি রোধ করে। 

বেনজোয়িক অ্যাসিডের অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল অ্যাক্টিভিটি 2.5 থেকে 4.0 পর্যন্ত নিম্ন pH রেঞ্জে সবথেকে ভালো কাজ করে । এই pH রেঞ্জে যা ঘটে তা হল বেনজোইক অ্যাসিডের একত্রিত রূপ জীবাণুর প্লাজমা ঝিল্লিতে প্রবেশ করে তাকে নষ্ট করে। এর ফলস্বরূপ খাদ্য নষ্ট করে এমন বেশিরভাগ জীবাণুর বৃদ্ধি এবং বেঁচে থাকাকে বাধা দেয়। 

বেনজোয়িক অ্যাসিড প্রসাধনীতেও প্রিজারভেটিভ হিসাবেও ব্যবহৃত হয়।